২৬শে বৈশাখ,
রেডিওটা আজ জ্বালিয়ে মারছে, সকাল থেকে শুধু প্রেমের গান। তার ওপর একটা নাছোরবান্দা কোকিল সমানে ডেকে চলেছে সন্ধে থেকে। চাঁদের আলো আজ সুগন্ধের মত ভরিয়ে দিয়েছে অর্ধেক পৃথিবী। হাওয়ার উথাল- পাথাল আদরে শহরের skyscraper গুলোর চোখের ঘুম গেছে উড়ে। প্রেমিক রেডিও, পাগল কোকিল,মাতাল হাওয়া আর পূর্নীমার চাঁদ। নাঃ এযাত্রা আর বাঁচবনা মনে হচ্ছে।
সিগারেটের ৩ নম্বর ফাঁকা প্যাকেটটা পরে আছে পাশে। গলা শুকিয়ে কাঠ। আয়নায় নিজের খুঁতগুলো খুঁটিয়ে দেখেছি অনেক্ষন, উঁহুঁঃ কোনো চান্সই নেই।
আজ মন খুব অস্থির। সামনে পরীক্ষা, আর কাল তার "চিত্রাঙ্গদা" দেখে পড়াশনা সব ডকে উঠেছে। কেন এত হ্যাল্ হ্যালাচ্ছ বাপ, ওনার জন্য তো ছেলে দেখা হচ্ছে। উনিও নিশ্চই মনের আনন্দে সুখস্বপ্ন দেখছেন। আমার যদিও রাগের কোন কারন নেই, তবু ভীষণ রাগ হচ্ছে। শালার রেডিওটাকে মনে হচ্ছে ছুঁড়ে সাত সমুদ্র তের নদীর পারে ফেলে দি। কোকিলটার ঘাড় এবার মটকাবো। ষোলো কলা পুর্ন চাঁদটাকে মনেহচ্ছে ষোলো টুকরো করে ষোলো জায়গায় পুঁতে দি। আর এই হাওয়ার স্যুইচটা যদি হাতের কাছে পেতাম! ভগবানের ঘরে কি শালা লোডশেডিংও হয়না!
বেশ তো ছিলি বাবা নিজের জীবনানন্দ, শঙ্খ ঘোষ, লিটল্ ম্যাগ নিয়ে। বেশ তো চলছিল চায়ের কাপে তুফান, টিউশানির মাইনে পেয়ে নিষিদ্ধ নিয়ম ভাঙার আগুন তরল। একটা ইমম্যাচিওর,নন্-ইন্টেলেকচ্যুয়াল, পুঁচকে মেয়ে,তোর সব আঁতলামো, সব ম্যাচিওরিটি, সব স্বাধীনতা একমূহুর্তে বানভাসী করে দিল!
হত শালা পাঁচ-দশ লক্ষ বছর আগেকার ব্যাপার, মাথায় মুগুড় ভেঙে হিঁচড়ে আনতাম ভালবাসা। কিন্তু হায়! সভ্যতার বেড়ি পরেছে আজ পৌরুষের দুহাতে। পাওয়ার ডাইমেসন গেছে উলটে। হাস্য, লাস্য, কটাক্ষ ও আরো বিবিধ প্রহরণ ধারন করে তেনারা আজকাল হাতে মাথা কাটেন।
সাঁজের ডাইরী থেকে
২৬শে বৈশাখ,
রেডিওটা কি আজ বেশিই সুরে বাজছে! নইলে এতবার শোনা গানগুলো প্রায় অপার্থীব লাগছে কেন? কোকিলটা বুঝি আজ আমার জন্যই গেয়েছে সারা সন্ধে। আমার সুখই বুঝি আজ ষোলকলা পুর্ন চাঁদ হয়ে আলোকিত করছে পৃথিবী। বাতাস আজ কিসের আনন্দে মেতেছে? ওর নাচও কি দেখতে আসবে কেউ?
কাল প্রোগ্রামে সায়হ্ন এসেছিল।আমি এক ঝলকের জন্যই দেখতে পাই, তারপড় বোধ হয় লুকিয়ে পরে বোকাটা। সকালে ফোন করে অস্বাধারন,অভূতপূর্ব, অবিস্মরনীয়, অনির্বচনীয়...... উফ কান ঝালাপালা করে দিয়েছে!
আচ্ছা হাঁদারাম তুইকি বুঝিসনি, কাল রাতের অস্বাধারন, অভূতপূর্ব, অবিস্মরনীয়, অনির্বচনীয় আমার নাচ শুধু মাত্র তোর জন্য ছিল? কাল চিত্রাঙ্গদা তার সমস্ত ইন্দ্রিয়, সমস্ত স্বত্বা, দিয়ে যে অর্জুনকে খুজছিল সে ফেডেড জিন্স আর পান্জাবী পড়ে আঁতেলের রাজ পোশাকে দাঁড়িয়ে ছিল দর্শকের পিছনের সারিতে।
তুই কি জানিস, কাল প্রোগ্রামের পর প্রায় দুঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম মেকআপ না মুছে, শুধু তোকে একবার দেখব বলে, শুধু তোর চোখের প্রসংসার দ্যুতি দুচোখ দিয়ে শরীরে নেব বলে।
বাড়ি থেকে ছেলে দেখা হচ্ছে নিশ্চই খবর গেছে। কিন্তু এটা কি তুই বুঝিস ভালবাসার জন্য আমি একটা বিয়ের সমন্ধ কেন, প্রয়োজনে পাত্রের হাড় ভাংতেও পিছপা হবনা।
ম্যাচিওর্ড, বুদ্ধিদীপ্ত, ইন্টেলেকচুয়াল, পন্ডিতটি যদি একটা ইমম্যাচিওর্ড, বোকা মেয়ের ভালবাসা না বুঝতে পারে তাহলে তার কিসের গর্ব?
সামনে পরীক্ষা, পড়াশোনা নিশ্চই মাথায় উঠেছে, হাঃ ওরে আঁতেল আমার একটু হাসি একটু কটাক্ষ তোর সব ইন্টেকচুয়ালিটি, সব ম্যাচুইরিটি বানের জলে ভাসিয়ে দিতে পারে। আমার ম্যানিকিওর করা আঙ্গুলের ছোঁয়ায় গুলিয়ে যায় তোর সব বুদ্ধিদীপ্তি। তোর বাহু বলে গর্বে ফোলানো বেলুন আমার আই লাইনারের এক খোঁচায় চুপসে যায়। বুনো ঘোড়াকে বশ করার মন্ত্র মেয়েরা যে গর্ভ থেকে শিখে আসে।
[এটা একটা গল্প তাই একটা গল্পের হাওয়া, গল্পের গেছো গোড়ুর মত হাওয়া আরকি, সাঁজের ডাইরীর এই পাতা টা উড়িয়ে নিয়ে ফেলে সায়হ্নর কাছে]
সায়হ্নর ডাইরী থেকে
২৭শে বৈশাখ,
হে রেডিও, হে কোকিল, হে চাঁদ, হে বাতাস। আজ সবাইকে ক্ষমা করলাম। হে রেডিও তোমার সস্তা রোম্যান্টিসম আজ ক্ষমা করলাম। হে কোকিল তোমার সারা সন্ধের বাউল গান আজ ক্ষমা করলাম। হে চাঁদ তোমার নির্লজ্জ আলোকোচ্ছাস আজ ক্ষমা করলাম। হে বতাস তোমার মাতাল নাচন আজ ক্ষমা করলাম। হে বেলতলা স্পোর্টিং এর মারকুট্টা ডিফেন্ডার তোকেও ক্ষমা করে দিলাম আজ শেষ বারের মত। শুধু একটা ব্যাপারেই আমি ক্ষমা প্রার্থী নিজের কাছে। আজও আমার পড়তে বসা হলনা।